ভারতের নাগরিক সিংবীর সিং। একদশক আগে তিনি আরও কয়েকজন ভারতীয় নাগরিকের সঙ্গে নগরের চকবাজারের জয়নগর এলাকায় শিখ টেম্পলে আসেন পূজা-অর্চনা করতে। কিন্তু পূজা-অর্চনা শেষে সবাই নিজ দেশে (ভারত) ফিরে গেলেও যাননি সিংবীর সিং।
ভারতীয় নাগরিক হয়েও দীর্ঘদিন ধরে এই মন্দির পরিচালনা করে আসছেন সিংবীর সিং। টেম্পল পরিচালনা কমিটির সাবেক সদস্য হলেও মন্দিরের সব কাজের দেখভাল তিনিই করেন। অভিযোগ উঠেছে, মন্দিরের দেড়শ কোটি টাকার সম্পদের লোভেই তিনি বাংলাদেশ ছাড়েননি। এমনকি এখানে থাকা পাকাপোক্ত করতে তিনি বিয়েও করেছেন এক বাংলাদেশি নারীকে!
নিয়ম অনুযায়ী, ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে যেকোনো দেশের নাগরিক ভ্রমণ ভিসা নিয়ে বাংলাদেশে আসতে পারেন। তবে একটা নির্দিষ্ট সময় ও ধর্মীয় কাজ শেষে পুনরায় নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার কথা ওই নাগরিকের। কিন্তু সিংবীর সিংর ক্ষেত্রে এমনটা ঘটেনি। তিনি ঢাকার এক নারীকে বিয়ে করে দীর্ঘদিন ধরে শিখ টেম্পল এস্টেটের সব কাজকর্ম পরিচালনার পাশাপাশি মন্দিরের ভেতরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন।
অভিযোগ রয়েছে, ধর্ম প্রচার কিংবা মন্দিরের পূজা করা নয়, শিখ টেম্পল এস্টেটের দেড়শ কোটি টাকার সম্পদ নিজের ভোগদখলে নেওয়ার চেষ্টায় লিপ্ত সিংবীর সিং ও ওই কমিটির লোকজন। টেম্পলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান দেখিয়ে বিদেশ থেকে আনা দানের অর্থ একচেটিয়ায় ভোগ করছেন সিংবীর সিং। এসব অর্থ পাচারও করছেন ভারতে। এর আগে সিংবীর সিং আগের কমিটির ফাউন্ডার দেওয়ান মহাজন সিং মন্দিরের উনয়ন্ননের ইস্যু তুলে আট শতক জায়গা বিক্রি করে দেন।
বর্তমানে শিখ টেম্পল এস্টেটের সম্পত্তি বেচাকেনায় নিষেধাজ্ঞা থাকলেও সাবেক কমিটির লোকজন দিয়ে নতুন কমিটি করার দৌড়ঝাঁপ শুরু করেছেন সিংবীর সিং। সর্বশেষ শিখ টেম্পল এস্টেটের কমিটির গঠিত হয় ২০১৮ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। শিখ টেম্পল এস্টেট দেবোত্তর সম্পত্তি বিধায় বর্তমানে চট্টগ্রাম জেলা জজ একজন বিচারকের মাধ্যমে ওই কমিটির কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
এদিকে বর্তমান কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও এখনো শিখ টেম্পল এস্টেটের যাবতীয় কার্যক্রম পরিচালনা করছেন সিংবীর সিং ও তাঁর পরিবারের লোকজন।
জানা যায়, সিংবীর সিং ভারতের পাঞ্জাব রাজ্যের অমৃতসর এলাকার সুখ দেব সিংয়ের ছেলে। ২০১৬ সালের ২১ আগস্ট থেকে ২০২৬ সালের ২১ আগস্ট পর্যন্ত তাঁর পাসপোর্টের মেয়াদ উল্লেখ রয়েছে। তিনি জন্মগ্রহণ করেন ১৯৮৮ সালের ১৫ এপ্রিল ভারতের পাঞ্জাবে রাজ্যে অমৃতসর এলাকায়। তাঁর বর্তমান পাসপোর্টটি ভারতীয়।

১৯৮১ সালের ১০ সেপ্টেম্বর শিখ টেম্পল এস্টেটের আট শতক জায়গা বিক্রি করেন সাবেক মন্দিরের ফাউন্ডার দেওয়ান মোহন সিং। জায়গাটি খুবই অল্প মূল্যে কিনে ছিলেন কাজী মহসিন চৌধুরী। ২০০৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর জায়গাটির বিএস খতিয়ান নামজারি করা হয়।
২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর শিখ টেম্পল এস্টেটের জায়গা বিক্রির চেষ্টা ও মন্দিরের অস্থায়ী সম্পদ বিক্রির অভিযোগ করা হয় সিএমপির পুলিশ কমিশনার বরাবরে। শিখ টেম্পল কমিটির সদস্য সিংবীর সিং ও ওই কমিটির লোকজনের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ দায়ের করেন বংশানুক্রম সেবায়েত মোহন্ত শ্রী গৌরাঙ্গ সিং।
২০১৯ সালের ২৭ মার্চ ভারতের পাঞ্জাব থেকে চকবাজার শিখ টেম্পল এস্টেটের পূজা-অর্চনার নামে দীর্ঘমেয়াদি থাকার উদ্দেশে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন সিংবীর সিং। চট্টগ্রামের ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার কাছে এ অভিযোগ করেছেন শিখ টেম্পল এস্টেটের বংশানুক্রম সেবায়েত মোহন্ত শ্রী গৌরাঙ্গ সিং।
২০২২ সালের ১১ এপ্রিল শিখ টেম্পল এস্টেটের বংশানুক্রম সেবায়েত মোহন্ত শ্রী গৌরাঙ্গ সিংয়ের দায়ের করার মামলায় শিখ টেম্পলের এস্টেটের জায়গা বেচাকেনার ওপর অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে হাইকোর্টে।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চকবাজার থানার ৩৬ নম্বর জয়নগর অর্থাৎ বর্তমানে চকবাজারের গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের দিকে মুখপথে হাতের বাম দিকে পশ্চিমের গলিতে চারিদিকে সীমানা প্রাচীরবেষ্টিত শিখ টেম্পল এস্টেটের জায়গা ঘিরে রয়েছে দুটি মন্দির। একটি শিখ টেম্পল এস্টেটের, অপরটি শ্রীশ্রী শালগ্রাম শিলাচক্র মন্দির। পুরো জায়গাটি ৬৪ শতকের। টেম্পলের ভেতরে ছয়টি অস্থায়ী ভাড়া ঘর রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, ভাড়ার টাকা মন্দিরের উন্নয়নকাজে তেমন ব্যবহার করা হচ্ছে না। এসব টাকা নিয়ে যাচ্ছে সিংবীর সিংয়ের পরিবার। আর মন্দিরের ভেতরে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন ভারতীয় নাগরিক সিংবীর সিং। বর্তমানে শিখ টেম্পল এস্টেটের জায়গার প্রতি শতকের দাম কোটি টাকারও বেশি বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে শিখ টেম্পল এস্টেটের বংশানুক্রম সেবায়েত মোহন্ত শ্রী গৌরাঙ্গ সিং আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, ‘আমি শিখ টেম্পল এস্টেটের স্থায়ী সেবায়েত। ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে ১৯৩৯ সাল থেকে শিখ টেম্পলে স্থায়ীভাবে বসবাস করে আসছি মন্দিরের ভেতর। মন্দিরের ভেতরে আমার পৈত্রিক সম্পত্তি রয়েছে। আমি আমার জায়গায় পরিবার নিয়ে বসবাস করছি। টেম্পলের সেবায়েতের দায়িত্ব পালনও করছি। মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটির সদস্য সিংবীর সিংসহ তাঁর লোকজন ভারত থেকে এসে কিছুদিনের জন্য পূজা-অর্চনা করে। এরপর সবাই চলে গেলেও সিংবীর সিং সেই ২০১২ সাল থেকে এখানে পূজা করতে এসে কৌশলে ঢাকার এক নারীকে বিয়ে করে টেম্পলে স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, মন্দিরের কমিটির বলবৎ না থাকা স্বত্বেও তিনি মন্দিরের মূল ভূমিকায় নিজেকেই উপস্থাপন করে আসছেন সিংবীর সিং। কমিটি না থাকার পরও গোপনে চলছে শিখ টেম্পলের কমিটির করারও দৌড়ঝাঁপ। পূজা করার নাম দিয়ে একজন ভিনদেশি নাগরিক হয়ে কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে বসবাস করছে প্রশাসনের কাছে তদন্ত করে দেখার অনুরোধ জানাই।
জানতে চাইলে সিংবীর সিং আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, আমি পূজারি। শিখ টেম্পল এস্টেটে পূজা-অর্চনা করা আমার মূল উদ্দেশ্য। টেম্পল পরিচালনায় কমিটি করেন চট্টগ্রাম জেলা জজ। আমার স্ত্রী বাংলাদেশি। আমার দুটি সন্তান রয়েছে, তারা এদেশের নাগরিক। আমি ভারতে যাই, কিছুদিন পরপর পরিবারের টানে আবার বাংলাদেশে চলে আসি।
চট্টগ্রাম নগর থেকে আরও পড়ুন


