উন্নয়নের ক্ষত এখন দুর্ঘটনার ফাঁদ, জলাবদ্ধতায় নতুন বিপদ

শফিক সাহেব বাড়ির গেটে দাঁড়িয়ে ছিলেন রিকশার অপেক্ষায়। অফিসের দেরি হচ্ছে, এদিকে রাস্তায় হাঁটুপানি। একঘণ্টার বেশি সময় পর রিকশা এল। চারগুণ বেশি ভাড়ায় উঠেও পড়লেন। তবে কিছুদূর না যেতেই বিপত্তি। রাস্তার গর্তে পড়ে আচমকা কাত হয়ে পড়ল রিকশা। শফিক সাহেব ও রিকশাচালক, চোট পেলেন দুজনেই। একটু আগে নতুন জুতা ভেজা ঠেকাতে ব্যস্ত শফিক সাহেবের ভিজল পুরো শরীরটাই। সঙ্গে জুটল জখম।

দৃশ্যটি নগরের বাকলিয়ার। সেবা সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীন উন্নয়ন প্রকল্পের ক্ষত এভাবেই দুর্ঘটনার ফাঁদ পেতে আছে নগরজুড়ে। আরও নির্দিষ্ট করে বললে, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ) ও চট্টগ্রাম ওয়াসার সমন্বয়হীন প্রকল্পের কারণে দীর্ঘদিন ধরে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নগরবাসীকে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতার শঙ্কার সঙ্গে বড় ধরনের দুর্ঘটনার সম্ভাবনাও তাই চোখ রাঙাচ্ছে।

মেগা প্রকল্পে বড় ক্ষত

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ। এ প্রকল্পের দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে অভিযোগ অনেকদিনের। প্রকল্পের কাজের প্রক্রিয়া নিয়েও আছে বিস্তর অভিযোগ। বিশেষ করে খালে স্লুইস গেট, রিটেইনিং ওয়াল, কালভার্ট নির্মাণ কাজের অংশ হিসেবে দেওয়া বাঁধের কারণে পানি নিষ্কাশন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

গত ৩০ মে নগরে অনুষ্ঠিত এক সভায় বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভপ্রকাশ করেন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরী। এসময় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্তৃপক্ষের প্রতি দ্রুত খালের বাঁধ কেটে দেওয়ার আহ্বানও জানান তিনি।

তবে শুধু সিটি মেয়রই নন, প্রকল্পের কাজের ধীরগতি ও সমন্বয়হীনতা নিয়ে অভিযোগ আছে নগরের সাধারণ মানুষেরও। প্রকল্পের আওতায় নালা সম্প্রসারণের জন্য রাস্তা কাটার সময় অনেকক্ষেত্রে প্রায় পুরো রাস্তাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে ছোট-বড় অসংখ্য খানা-খন্দ। যা জলাবদ্ধতার সময়ে হয়ে উঠতে পারে বিপজ্জনক ফাঁদ।

সরেজমিন নগরের দেওয়ানবাজার, ডিসি রোড ও বগার বিল এলাকায় দেখা যায়, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের আওতাধীন নালার পুনর্নির্মাণ কাজ প্রায় শেষের পথে। তবে নালার পাশের মূল রাস্তার অনেকটাই এখন চলাচলের অনুপযোগী।

এসব রাস্তায় খানা-খন্দের কারণে ইতোমধ্যে বেশকিছু দুর্ঘটনা ঘটেছে। আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রাস্তা পানিতে তলিয়ে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে বলে শঙ্কাপ্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। বিষয়টি মাথায় রেখে এসব রাস্তা দ্রুত সংস্কারের দাবি তুলেছেন এলাকার মানুষ।

অবশ্য শুধু এসব এলাকাই নয়, সিডিএ’র জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কাজ চলাকালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নগরের অনেক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা। জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে এই রাস্তাগুলো বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।

ওয়াসার ছোট কাজে বড় বিপদ

চট্টগ্রাম ওয়াসার খোঁড়াখুঁড়ি নিয়ে নগরবাসীর অভিযোগ অনেকদিনের। একই রাস্তা একাধিকবার কাটা ওয়াসার জন্য নতুন কিছু নয়। এমনকি সদ্য উদ্বোধন হওয়া রাস্তাও কেটে ফেলার অভিযোগ রয়েছে ওয়াসার বিরুদ্ধে।

সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, রাস্তা কাটার পর অনেকসময় ইট-বালি দিয়ে কোনোরকমে গর্ত ভরাট করেই দায় সারেন ওয়াসার কর্মীরা। যে কারণে এসব রাস্তায় থেকে যায় ছোট-বড় খানা-খন্দ। বাড়ে দুর্ঘটনার ঝুঁকি।

বর্ষা মৌসুমে এসব খানা-খন্দ বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। রাস্তায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলে চলতিপথে এসব গর্ত দেখার সুযোগ মেলে না। যে কারণে সতর্কতার সঙ্গে চলার পরও অনেকে দুর্ঘটনায় পড়েন। যানবাহন তো বটেই, পথচারীরাও অনেক সময় দুর্ঘটনার শিকার হন।

দায় এড়াতে পারে না সিটি করপোরেশনও

নগরের রাস্তায় খানা-খন্দের জন্য মূলত সিডিএ ও ওয়াসাকে দোষারোপ করা হলেও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনেরও (চসিক) দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। উন্নয়ন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা দ্রুত মেরামতে চসিকের উল্লেখ করার মতো কোনো পদক্ষেপ এখন পর্যন্ত চোখে পড়েনি। ‘রুটিনওয়ার্কে’র অংশ হিসেবে কিছু সংস্কার কাজ হলেও, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রে মূল রাস্তাতেই সীমাবদ্ধ থাকে। গলি-উপগলির ভাঙা রাস্তা ‘ক্ষত-বিক্ষত’ই রয়ে যায়।

৫ এলাকায় বেশি দুর্ভোগ

নগরের বাকলিয়া, মাঝিরঘাট, আগ্রাবাদ, নয়াবাজার ও চান্দগাঁও এলাকার বেশকিছু রাস্তায় খানা-খন্দের কারণে বর্ষা মৌসুমে দুর্ঘটনার ঝুঁকি থাকে বেশি। এবারও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে মুরাদপুর, প্রবর্তক মোড়সহ নগরের অধিকাংশ রাস্তাতেই জলাবদ্ধতার কারণে কম-বেশি ভোগান্তিতে পড়েন চলাচলকারীরা।

সিডিএ-ওয়াসাকে দুষলেন মেয়র

এসব বিষয়ে জানতে কথা হয় চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র মো. রেজাউল করিম চৌধুরীর সঙ্গে। নগরের রাস্তায় উন্নয়ন প্রকল্পের কারণে সৃষ্ট এসব ক্ষতের জন্য সিডিএ এবং ওয়াসার দিকে অভিযোগের আঙুল তোলেন তিনি।

মেয়র রেজাউল করিম চৌধুরী আলোকিত চট্টগ্রামকে বলেন, নগরীর জলাবদ্ধতা নিয়ে আমাদের বক্তব্য আপনারা ইতোমধ্যেই শুনেছেন। জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সিডিএ। তারাই মূল বিষয়টি দেখছে। আমরা আমাদের আওতাধীন ছোটখাটো যেসব নালা-নর্দমা আছে, সেগুলো তো পরিষ্কার করছিই।

ওয়াসার রাস্তা কাটা প্রসঙ্গে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বলেন, ওয়াসা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে এ বিষয়ে আমাদের কথা হয়েছে। এ ব্যাপারে সদরঘাট থেকে বারিক বিল্ডিং সড়কের কথা বলতে পারি। রাস্তাটির অবস্থা আগে খুবই খারাপ ছিল। আমি দায়িত্ব নেওয়ার পর রাস্তাটির উন্নয়নকাজে হাত দিই। বর্তমানে এই রাস্তার সংস্কারকাজ অনেকটাই এগিয়ে গেছে। এরমধ্যেই ওয়াসার পাইপ ফেটে যাওয়ার পর রাস্তাটি আবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরপর আমরা ওয়াসা কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে চিঠি দিয়েছি। ভবিষ্যতে যদি এ ধরনের ঘটনা ঘটে, আমরা ক্ষতিপূরণ দাবি করব। কারণ আমরা রাস্তা ঠিক করব, ওনারা কেটে তা নষ্ট করবেন, নগরবাসীকে দুর্ভোগে ফেলবেন, রাস্তার ওপর পানি সয়লাব হয়ে যাবে, এটা তো মেনে নেওয়া যায় না।

সিডিএ’র জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সিডিএ কর্তৃপক্ষকে আমরা বলেছি, আপনারা ড্রেন করছেন ১০ ফুট, রাস্তা নষ্ট হচ্ছে আরও ছয় ফুট। এর মাশুল দিতে হচ্ছে সিটি করপোরেশনকে। আমাদের আর্থিক বিষয়টাও তো দেখতে হবে। সিটি করপোরেশনের অর্থের অপচয় হচ্ছে। তাই আমাদের বক্তব্য, তারা এভাবে রাস্তা কাটতে পারেন না। যেকোনো রাস্তা কাটতে হলে আমাদের অনুমতি নিতে হবে। আমাদের প্রকৌশলীরা বিষয়টা দেখবেন। যতটুকু অনুমতি দেওয়া হবে, রাস্তা ততটুকুই কাটবেন। এর বাইরে কাটা যাবে না।

আলোকিত চট্টগ্রাম

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।

ksrm